দক্ষিণ সুরমায় ভারতীয় শিলং তীরের মূলহোতা জুয়াড়ী শিপলু বেপরোয়া

প্রকাশিত: ১:০৪ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০১৯

দক্ষিণ সুরমায় ভারতীয় শিলং তীরের মূলহোতা জুয়াড়ী শিপলু বেপরোয়া

সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় ভয়াবহরূপ ধারণ করেছে ভারতীয় শিলং তীর খেলা। এ তীর খেলা এখন শুধু সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্ত পেরিয়ে এ খেলা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ‘তীর খেলা’য় অংশ নিচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। সিলেটের যেকোন এলাকায় বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা বাজি ধরছে শিলং জুয়ায়। সপ্তাহের ছয়দিনই এ খেলাটি বসে। প্রতিদিন দুইবার এ খেলার ড্র অনুষ্টিত হয়ে থাকে।

দক্ষিণ সুরমায় তাদের এজেন্টের মাধ্যমে এদেশীয় এজেন্টরা ভারতের এজেন্টেদের সাথে জুয়ার আসরের সমন্বয় করে থাকে। আর ভারতীয় এ ভাগ্যের খেলায় টাকা হারিয়ে কপাল পুড়ছে স্কুল কলেজের ছাত্র, শিক্ষক, দিনমজুর, রিকশাচালক, যানবাহনের চালক-শ্রমিকসহ বেকার যুবক এবং যুবতীদের। স্কুল পড়ুয়া ছেলেরা ক্লাস ফাকি দিয়ে বাসা থেকে টাকা নিয়ে অংশ নিচ্ছে ভারতীয় এ জুয়ায়। এতে করে ছাত্রদের মনযোগ বইয়ের পরিবর্তে তীর খেলার দিকেই বেশী ঝুঁকছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেও দমন করা যাচ্ছে না এ জুয়া। পুলিশ ধাওয়া করার পর-পরই আবার এ খেলায় জড়িয়ে পড়ছে জুয়াড়িরা। কারণ গ্রামের ভাষায় একটি প্রবাদ আছে ‘চুর কখনও ধর্মের কথা শুনেনা’। আর এসবের মূলহোতা দক্ষিণ সুরমা টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ (সাবেক ভোকেশনাল) এর শিক্ষক খোজারখলা এলাকার মোস্তফা মিয়া ছেলে শিপলু আহমদ। স্থানীয়দের মাঝে তীর সম্রাট হিসেবে খ্যাত শিপলু এখন সিলেটে তীরের প্রধান এজেন্ট। রাতদিন তীর খেলা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে সে। সহপাঠিদের নিয়ে দক্ষিণ সুরমার অলি-গলিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে এ জুয়া। শিপলু নিজেকে আড়ালে রেখে স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনীতিবীদ, নামধারী সাংবাদিক ও প্রশাসনকে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছে সমাজ ধ্বংসকারী এ জুয়া খেলা। এতে করে পরিবারের সুনাম নষ্ট করছে শিপলু জানান এলাকাবাসী। শিপলুর ভাই খোজারখলা আদর্শ সমাজ কল্যাণ সংঘের সাবেক সভাপতি ইকবাল ও তাবলীগ জমায়াতের সাথী পাপ্পুর সাথে রয়েছে তার মতবিরোধ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০ থেকে ২৫ বছর পূর্বে ভারতীয় ধনকুবেররা এ রকম খেলাটি আবিষ্কার করে। এর নাম রাখে মেঘালয়ের আঞ্চলিক ভাষায় ‘তীর খেলা’। স্থানীয়ভাবে খেলাটিকে অনেকেই শিলং তীর, ডিজিটাল নাম্বার খেলা ইত্যাদি নামে অবহিত করে থাকেন।

খেলাটির ধরণ হচ্ছে এ রকম যে এদেশের এজেন্টদের মাধ্যমে ১-৯৯ পর্যন্ত নাম্বার বিক্রয় করা হয় যে কোন মূল্যে। লটারিতে ০ থেকে ৯৯ পর্যন্ত যে কোনো সংখ্যা কিনে নেওয়া যায়। সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি ধরা যায়। যত মূল্যে সংখ্যাটি বিক্রয় হবে তার ৭০ গুণ লাভ দেয়া হবে বিজয়ী নম্বরকে। অর্থাৎ ১০ টাকায় ৭০০ টাকা। একই নম্বর একাধিক লোকও কিনতে পারেন। সবাই কেনা দামের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি টাকা পাবেন। প্রতিদিন বিকাল সোয়া ৪টায় ও সাড়ে ৫টায় দুবার এ লটারির ড্র অনুষ্টিত হয়ে থাকে। খেলার ফলাফল দেওয়া হয় অনলাইনে। ভারতের শিলং থেকে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জুয়ার আসরটি পরিচালনা করা হয়। আর এ ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ফলাফল জানাও যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দক্ষিণ সুরমা উপজেলার-কদমতলী পয়েন্ট, রেলওয়ে স্টেশন, শিববাড়ি বাজার, খালোমুখ বাজার, মোগলাবাজার, বৈরাগী বাজার, জালালপুর বাজার, দাউদপুর চৌধুরী বাজারসহ দক্ষিণ সুরমার বেশ কয়েকটি স্পটে ভারতীয় এ জুয়ার আসর বসে থাকে আর এ সবের মূল এজেন্ট হচ্ছে শিপলু আহমদ। তার মাধ্যমে ভারতীয় এই জুয়ার এখন পুরুষ-মহিলা, যুবক-যুবতীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর পেশার মানুষ এজেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যক্তি জানান, শিপলুর লোকজন যেকোনো স্থানে বসে নিরাপদে খেলার নাম্বার টুকন বিক্রয় করছেন। টুকন কেটে ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিপলু কিংবা তার বসানো নির্ধারিত লোকদের কাছে পাঠিয়ে দেন। তাদের দাবী ভারতীয় ‘তীর খেলা’ লটারির বিক্রেতাদের নিকট থেকে আইন প্রয়োগকারী দলের সদস্যরা বই প্রতি ৫শত হতে ৬শত টাকা হারে চাঁদা আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পূন্যভুমি সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার দিনের শুরুটা হয় শীলং তীর খেলা দিয়ে এবং শেষ হয় তাস তথা জোয়া খেলার মধ্য দিয়ে। এই খেলায় বেশিরভাগ মানুষ দিন মজুর। যারা সারা দিন রিক্সা চালিয়ে, কঠোর পরিশ্রম করে যা টাকা রোজগার করে তা জোয়ার আসরে দিয়ে পকেট ফাঁকা করে চাল ডাল না নিয়ে ঘরে ফিরে ‘শিলং তীর’ আর তাস নামক জুয়ার ভয়ঙ্কর ছোবলে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। এছাড়াও উপজেলার লালাবাজার, রশিদপুর, নাজির বাজার, কামাল বাজার, লাউয়াই, চন্ডিপুল, বাবনাপয়েন্টসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্টে জুয়া ও প্রতারণা পরিচালিত হয়ে আসছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজাম আহমদ জানান, আমরা তীর খেলা বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি, এখন শোনা যাচ্ছে তীর খেলার পাশাপাশি রাতে তাসের খেলা চলে আসছে। তিনি আরো বলেন, আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি যদি এ রকম হয় আমরা তা প্রতিরোধ করব। সব বিষয়ে প্রশাসনকে জোড়ালো ভূমিকা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, তীর খেলার ফলে এলাকায় অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনকে কোন প্রকার তোয়ক্কা না করে তাস তথা জুয়ায় যুব সমাজ ধ্বংস করছে শিপলু। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে প্রতিনিয়ত দক্ষিণ সুরমা এলাকায় বাড়ছে মারামারি, চুরি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ। শিপলু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও এলাকার মোড়লদের নানা কৌশলে অর্থ দিয়ে জুয়ার খেলার দিকে স্থানীয়দের ধাবিত করছে।

এ বিষয়ে উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সোহেল রেজা পিপিএম বলেন, দক্ষিণ সুরমা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতিতের চেয়ে এখন অনেক ভাল। আমরা ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। আর অপরাধের সাথে জড়িতদের সন্ধান পাওয়ার সাথে সাথে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ইন্টারনেট কেন্দ্রিক জুয়ার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করছি কিন্তু তারা জামিন পেয়ে আবারও জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। তবে আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। অপরাধীদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্যও তিনি আহবান জানান।

Sharing is caring!

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..