রাজধানী লাউড়ের রাজবাড়ির স্মৃতি রক্ষায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ

প্রকাশিত: ১০:০১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০১৮

রাজধানী লাউড়ের রাজবাড়ির স্মৃতি রক্ষায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ

হাবিব সারোয়ার আজাদ :: রাজধানী লাউড়ের ইতিহাস ঐতিহ্য রাজবাড়ির স্মৃতি রক্ষায় স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর প্রথমবারের মত জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে।’সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়দল (উওর) ইউনিয়নের হলহলিয়া গ্রামেই ছিল প্রাচীন জনপদ লাউড় রাজ্যের রাজধানী, রাজবাড়ি সহ নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা।’

শনিবার জেলা প্রশাসক সরজমিনে তাহিরপুরের হলহলিয়ায় রাজবাড়ির বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন শেষে ভুমি অফিসের মাধ্যমে ১ একর ৯৩ শতক ভুমি চিহিৃত করে লাল পতাকা টাঙ্গিয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করেন।’
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, প্রাচীন লাউড় রাজ্যের রাজধানী হলহলিয়া গ্রামে রাজবাড়ি এলাকায় সরকারি নিয়ন্ত্রনে ৫ একর ৬৫ শতক ভুমি ছিল। এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৩ একর ৭২ শতক জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়। বর্তমানে ১ একর ৯৩ শতক ভুমি পতিত রয়েছে।’ এবার পতিত ভুমিতে হাজার বছরের সু-প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যঘেরা লাউড় রাজ্যের রাজধানী ও রাজবাড়ির অবশিষ্ট চিহ্ন সহ নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কার করনে রাজবাড়ির স্মৃতি রক্ষায় জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছেন।’

ফিরে দেখা: ঐতিহাসিক তথ্যাবলী থেকে জানা যায়, অতি প্রাচীনকালে সুনামগঞ্জের লাউড় রাজা ভগদত্তের উপরাজধানী ছিল। জনশ্রুতি ও পুরাকীর্তি ইত্যাদির ভিত্তিতে বলা হয় লাউড় সিলেটের প্রাচীন রাজ্য, যা বর্তমান সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার আওতায় পড়ে।’

পুরাকীর্তি সূত্রে ধারণা করা হয়, মহাভারত যুদ্ধে নিহত রাজা ভগদত্তের পরে তাঁর বংশীয় ১৯ জন ঐতিহাসিক নৃপতি লাউড় অঞ্চলে রাজত্ব করেছেন। নিধনপুরের তাম্রলিপি সূত্রে বলা হয় ভাস্কর ভর্মন খ্রিস্টীয় ৬৫০ অব্দ পর্যন্ত এ অঞ্চলের রাজত্ব করেন। ভাস্কর বর্মনের পর স্বেচ্ছাদিনাথ শালস্থম্ভ (৬৫০-৬৭৫) দ্বারা বর্মনদের সিংহাসন অধিকৃত হয়। শালস্থম্ভের পর রাজা হর্ষবর্মন (রাজত্বকাল, ৭৩০-৭৫০) অত্র রাজ্যে রাজত্ব করেন।’ ওই সময় সমস্ত বঙ্গদেশ ভিন্ন ভিন্ন খন্ড রাজ্যে বিভক্ত হলে তখন সিলেটের প্রাচীন লাউড় রাজ্য কামরূপ থেকে বিভক্ত হয়ে একটি পৃথক স্বাধীন রাজ্য হিসেবে পরিণত হয়।’দশম শতাব্দীতে লাউড়, গৌড় ও জয়ন্তীয়া এই তিন রাজ্যে বিভক্ত ছিল সিলেট। পরবর্তীকালে (দ্বাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে) বিজয় মাণিক্য নামে জনৈক হিন্দু রাজা লাউড় রাজ্যে রাজত্ব করেন।’ ওই সময় লাউড় রাজ্যের সীমানা বর্তমান সমগ্র সুনামগঞ্জ জেলা ও ময়মনসিংহ জেলা এবং হবিগঞ্জ জেলার কিয়দাংশ নিয়ে গঠিত ছিল।’

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে রাজা বিজয় মাণিক্যর পরে লাউড়ে কে বা কারা শাসক ছিলেন তা অজ্ঞাত তবে ইতিহাসবিদ গণের মতে তেরশত শতাব্দীর পর চৌদ্দ’শ সালের প্রথমার্ধে কাত্যায়ন গোত্রিয় দিব্য সিংহ নামে নৃপতি লাউড়ে রাজত্ব করেন।’ ওই সময় লাউড়ে রাজ্যের রাজমন্ত্রী কুবেরাচার্য’র জ্ঞানের চর্চা ভারতবর্ষের অন্যতম বিদ্যাপীঠ নবদ্বীপ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল।’ এছাড়া উক্ত রাজ্যের নবগ্রামে মাধবেন্দ্রপুরী নামে আরেক জন জ্ঞানী সাধু পুরুষ বসবাস করতেন ওনার শিষ্যত্ব গ্রহন করে লাউড়ের যুবরাজ রমানাথ বা রামা ও মন্ত্রীতনয় অদ্বৈত্যেচার্য সারা ভারতবর্ষে স্মরণীয় হয়ে আছেন।’ রাজা দিব্য সিংহ রাজ্যভার তাঁর পুত্র রমানাথকে দিয়ে,শান্তি সাধনায় মন্ত্রীতনয় অদ্বৈত্যের আখড়ায় গিয়ে অদ্বৈত্যের উপদেশে সাহিত্য চর্চায় মনোযুগী হয়ে বাংলা ভাষায় বিঞ্চুভক্তি শাস্ত্র গ্রন্থ সহ আরও কয়েকটি গ্রন্থের অনুবাদ করেন।’ অতপর অদ্বৈত্য বাল্যলিলা গ্রন্থ রচনা করে কৃষ্ণদাস নামে আখ্যাত হন। মহাভারতের বাংলা অনুবাদক কবি সঞ্জয়ের জন্মও হয়েছে এই লাউড়ে।’ দিল্লী স¤্রাাট থেকে শুরু করে শ্রীহট্রের ইতিবৃত্তে বর্ণিত রয়েছে যে, উক্ত লাউড় রাজ্য সকল সময় স্বাধীন ছিল।’

কিন্তু কালের পরিক্রমায় আজকের লাউড়ের রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখে এ প্রজন্মের বুঝার বা অনুমান করার উপায় নেই যে এটি এককালে একটি বিশাল রাজ্যের রাজধানী ও অনেক ইতিহাস সৃষ্টিকারী নগরী ছিল।’

জেল্রা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম রবিবার জানান, লাউড় সুদুর প্রাচীনকালে লাউড় রাজ্যের রাজধানী হলহলিয়া গ্রামে এখনো প্রাচীন আমলে নির্মিত রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দ’ুটি পাকা ফটক, বিভিন œস্থানে কিছু সীমানা প্রাচীরের অংশ রয়েছে।’ ইতিহাস সংরক্ষণের অংশ হিসেবেই এগুলো রক্ষা করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।’ পাশাপাশি প্রাচীন স্থাপনাগুলো রক্ষায় স্থানীয় লোকজনকে সহায়তা করার আহবান জানান তিনি।’

প্রাচীন লাউড় রাজ্যের স্থাপনা পরির্দশনকালে জেলা প্রশাসক ছাড়াও তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সহ এলাকার গণ্যমান্য লোকজন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Sharing is caring!

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..