সিলেটে টিলাকাটা রোধ ও পাথর কোয়ারিগুলোর ব্যবস্থাপনায় সচেতন গোষ্ঠীর উদ্যোগ

প্রকাশিত: 11:57 PM, June 6, 2018

সিলেটে টিলাকাটা রোধ ও পাথর কোয়ারিগুলোর ব্যবস্থাপনায় সচেতন গোষ্ঠীর উদ্যোগ

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : প্রকৃতির লীলা ভ‚মি সিলেটের পরিবেশ রক্ষার জন্য ব্যাপক প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। টিলাকাটা রোধ ও পাথর কোয়ারিগুলোর ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সচেতন গোষ্ঠীর উদ্যোগে ইতিবাচক কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের পরিচালক মোঃ ছালাহ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, সিলেটে টিলাকাটার বিরুদ্ধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স অবস্থান নিয়েছে। টিলাকাটার ব্যাপারে কোন ছাড় দেয়া হচ্ছে না। ফলে, টিলাকাটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, পাথর কোয়ারিগুলোতে প্রতিমাসে টাস্কফোর্স অভিযান চালাচ্ছে। বোমা মেশিনের ব্যবহার বন্ধ করার প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে। সিলেটের পরিবেশ অনেক ভালো আছে। এখানে শিল্পকারখানা খুব একটা নেই। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার জন্য চলমান কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে প্রকৃতিকন্যা হয়েই থাকবে সিলেট।

সিলেটের পরিবেশ রক্ষা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট-এর সমন্বয়ক আব্দুল করিম বলেন, পরিবেশ রক্ষায় অভিযান পরিচালনা সত্তে¡ও পরিবেশ বিনাশী কর্মকাÐ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এব্যাপারে আরো কঠোর হতে হবে।

তিনি বলেন, সিলেটে পরিবেশ বিনষ্টকারী কর্মকাÐগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্বিচারে টিলাকাটা এবং পাথর কোয়ারিতে বোমা মেশিন, এক্সকাভেটর ইত্যাদি যন্ত্রদানবের ব্যবহার। সিলেটে শিল্পকারখানা তেমন গড়ে না উঠায় শিল্পবর্জ্যে পরিবেশ দূষণের বিষয়টি এখনো গৌণ।

পরিচালক মোঃ ছালাহ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, সিলেটে পরিবেশ সুরক্ষায় দুটি বিষয়ে জোর দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। টিলাকাটা কঠোরভাবে দমন এবং পাথর কোয়ারিতে বোমা মেশিনের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা। এ লক্ষ্যে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা ও কঠোর নজরদারির পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, মাইকিং, সভা-সেমিনার করা হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্বুদ্ধ ও অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়েছে। এতে সফলতা আসছে। টিলা কাটা এবং পাথর কোয়ারিতে বোমা মেশিনের ব্যবহার অনেক কমে এসেছে।

নয়না ভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্মল পরিবেশের জন্য সিলেটের খ্যাতি দেশ-বিদেশে। উঁচু-নীচু পাহাড়-টিলা, ঝর্ণার স্বচ্ছ জলধারা, ঘনসবুজ চা বাগান সিলেটকে করছে নয়নাভিরাম। হাকালুকি, টাঙুয়াসহ অসংখ্য হাওর-বাওর, বিল-ঝিল ছড়িয়ে আছে সিলেট জুড়ে। সিলেটের বালু-পাথরে নির্মিত হচ্ছে সড়ক, সেতু আর অট্টালিকা। প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্য সিলেটকে ‘প্রকৃতিকন্যা’ নামে পরিচিতি দিয়েছে। তবে সম্পদ আহরণের জন্য অবৈধ মুনাফালোভীদের শ্যেন দৃষ্টিতেও বরাবরই ছিল সিলেট। তারা সময়ে সময়ে সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ছিন্নভিন্ন করেছে। তারা এক্সকাভেটর, বোমা মেশিন ইত্যাদি যন্ত্রদানব দিয়ে পাথর তোলার জন্য খুবলে খেয়েছে সিলেটের পাথর কোয়ারি অধ্যুষিত এলাকাকে। টিলা কেটে নীচু জমি ভরাট এবং হাউজিং ব্যবসা হয়েছে দেদারছে। সিলেটের পরিবেশ সচেতন নাগরিকেরা পাহাড়-টিলা কাটা বন্ধ এবং পাথর কোয়ারিতে বোমা মেশিন, এক্সকাভেটর নিষিদ্ধ করার দাবিতে সোচ্চার বহুদিন ধরে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার ভিত্তিক ১০ প্রকল্পের মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত হলে এব্যাপারে আরো সচেতন হয় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। কর্তৃপক্ষ পরিবেশ বিনাশী কর্মকাÐের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নিতে শুরু করে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, সিলেট বিভাগের পাহাড়-টিলা অধ্যুষিত এলাকায় অতীতে বেআইনিভাবে পাহাড়-টিলা কাটা হতো। বিশেষ করে সিলেট সদর উপজেলার বিমানবন্দর, বড়শালা, পাঠানটুলা, খিদিরপুর, পীরেরবাজার, দাসপাড়া, দত্তপাড়া, খাদিমনগর, বটেশ^র; জৈন্তাপুর উপজেলার করমাটি, ঠাকুরের মাটি, চিকনাগুল, বাঘেরখাল; গোলাপগঞ্জ উপজেলার হেতিমগঞ্জ, ঘোষগাঁও, ঢাকাদক্ষিণ, রনকেলি, ধারাবহর, বাঘা; বিয়ানীবাজার উপজেলার বিয়ানীবাজার সদর, ফেনাগ্রাম, সুপাতলা, পাতন, জলঢুপ, খাসারীপাড়া; ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া, কায়স্তগ্রাম, মোমিনছড়া, আশিঘর, মাইজগাঁও; গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং, বল্লাঘাট, ফতেহপুর, লাখেরগাঁও, দেওয়ানের গাঁও; মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া, বড়লেখা, জুড়ি, কমলগঞ্জ উপজেলা এবং হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুর, বড়গাঁও, পানি উমদা প্রভৃতি এলাকায় পাহাড়-টিলা কাটার বিরুদ্ধে অভিযানে নামে পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরিবেশ অধিদপ্তর আরো জানায়, ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত এসব এলাকায় পাহাড়-টিলা কাটার ঘটনায় ১০১টি মামলা দায়ের করা হয়। এরমধ্যে ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মামলা দায়ের হয় ৯২টি। এছাড়া ২০১৬ সালে ৩টি, ২০১৭ সালে ৫টি ও চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মামলা হয়েছে ১টি। ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত টিলা কাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয় ১২২টি। এসব অভিযানে ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা বাবদ আদায় করা হয়েছে ৭৪ লাখ ৮ হাজার ২৮১ টাকা।

দেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে। এই উপজেলায় ছোট-বড় আরো পাথর কোয়ারি রয়েছে। এছাড়া সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট উপজেলায় অনেকগুলো পাথর কোয়ারির অবস্থান। এসব কোয়ারিতে পাথর উত্তোলনে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ বিনাশী কর্মকাÐ হয়েছে। এক্সকাভেটর নামের যন্ত্রদানব দিয়ে পাহাড়-টিলা, বাগান, ফসলি জমিতে গভীর গর্ত করে পাথর তোলা হয়েছে। পরে এসেছে বোমা মেশিন। এর মাধ্যমে মাটির তলদেশ চৌচির করে পাথর সংগ্রহ করা হয়। এতে পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ে। বিপদজনক পদ্ধতিতে পাথর তুলতে গিয়ে প্রাণহানিও হয়েছে অনেক শ্রমিকের। এ অবস্থায় পরিবেশবাদী সংগঠন আন্দোলনে নামে। পাশাপাশি উচ্চ আদালতে মামলা করা হয়। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বোমা মেশিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়সূত্র জানায়, পরিবেশ রক্ষায় পাথর কোয়ারিতে বোমা মেশিনের ব্যবহার বন্ধে টাস্কফোর্স নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে ২০১৪ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১২৪টি অভিযান চালিয়ে ৭৬৫টি বোমা মেশিন ও মেশিনের ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে জাফলং পাথর কোয়ারিতে একই সময়কালে ৩৬টি অভিযান চালিয়ে ১৩৬টি বোমা মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের পরিচালক মোঃ ছালাহ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সিলেটের পরিবেশের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের পরিবেশ বিভাগ সে উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করছে।

সূত্র-উত্তরপূর্ব২৪ডটকম

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

June 2018
S S M T W T F
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

সর্বশেষ খবর

………………………..