মৌলভীবাজারে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার

প্রকাশিত: 7:54 PM, April 26, 2018

আলী হোসেন , মৌলভীবাজার :: মাদকের অদৃশ্য আগ্রাসন এখন শহর ছাড়িয়ে মৌলভীবাজারের গ্রাম, জনপদ এবং চা শ্রমিক বস্তিতে প্রসারিত হয়েছে। দিন যতো গড়াচ্ছে এ আগ্রাসনের মাত্রা ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছে।পুরো জেলায় মাদকদ্রব্য ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। প্রভাব প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে চক্রটি সহজে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদকদ্রব্যের বিস্তার ঘটিয়ে অনেকটা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে ব্যবসা।

মৌলভীবাজার জেলায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইয়াবা বিশাল সিণ্ডিকেট। জেলার ভিতর দিয়ে পাচার হচ্ছে ইয়বার বড় বড় চালান। গত২৩ শে এপ্রিল  দিবাগত রাতে তিন হাজার পিস ইয়াবাসহ তিন ইয়াবা ব্যবসায়ীকে  আটক করেছে পুলিশ।
আটককৃতরা আন্ত: বিভাগীয় মাদক সম্রাট এবং ভারত, মায়ানমার থেকে বিশাল ইয়াবা চালান দেশে বিক্রি করত।
আজ  ২৪শে এপ্রিল দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল ইসলাম ।
তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে শ্রীমঙ্গল থেকে একটি ইয়াবার চালান মৌলভীবাজার আসছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ২৩ শেএপ্রিল  দিবাগত রাতে মোকাম বাজার এলাকায় একটি প্রাইভেটকারে (রেজিঃ নং- ঢাকা মেট্রো-ক-১১-০২৫৯) তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ সময় তিন হাজার পিস ইয়াবাসহ তিন ইয়াবা ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়।
আটককৃতরা হলেন, কুলাউড়া উপজেলার সাদেকপুরের জামান প্রকাশ রাহেল (৩৫) সদর উপজেলার গোবিন্দশ্রী এলাকার রাসেল আহমদ (২৮) ও কলিমাবাদ এলাকার  মোঃমুরাদ আলী মিলন (৩৪)। উদ্ধারকৃত ইয়াবার আনুমানিক মূল্য  প্রায়  ৯ লক্ষ টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে আরোও জানান, তাদের বিরুদ্ধে আগেও সদর থানায় মাদকদ্রব্য  মামলা ছিল। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আসামীগণ আন্ত: বিভাগীয় মাদক সম্রাট। তাহারা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মায়ানমার হইতে বড় বড় চালানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মাদক ব্যবসা করে আসছে।

আখাউড়া-কুলাউড়া রেলরুটের শমসেরনগর ও শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে হেরোইন, প্যাথেড্রিন, ফেনসিডিল, গাঁজা ও নেশা জাতীয় (সেক্সোয়াল) ট্যাবলেট জেলার সাত উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। ক্ষতিকারক যৌন উদ্দীপক (সেক্সোয়াল) ট্যাবলেট জেলার বিভিন্ন বড় বড় ফার্মেসিতে বিক্রি করার ফলে এসব ট্যাবলেট উঠতি বয়সী যুবক-যুবতীদের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, শুধু মৌলভীবাজার

জেলার ৭টি থানাতেই প্রতি মাসে দুই কোটি টাকার হেরোইন বিক্রি হচ্ছে। এ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক ক্যাডার এবং গডফাদাররা। এক সময় গ্রাম জনপদে মাদক বলতে গাজার প্রচলন ছিল সীমিত পরিসরে। এখন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের স্থানীয় পরিসংখ্যানে গ্রামওয়ারি মাদকসেবীদের সংখ্যা উন্নীত হয়েছে ১২ থেকে ১৫ জনে। কারও উপস্থিতি প্রকাশ্যে আবার কারও অবস্থান রয়েছে আঁড়ালে।সংশ্লি¬ষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, মাদকের উপকরণ হিসেবে ফেনসিডিলের প্রয়োগ শুরু হয় ৮০ দশকের সূচনাতে। তার আগে প্রচলিত ছিল মৃতসঞ্জিবনী সুরা। এটি নিষিদ্ধ হবার পর ফেনসিডিলের প্রসার বাড়তে থাকে। জেলার বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য প্রবেশ শুরু হয়।

তবে বড় চালান আসতো ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়া থেকে। শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন থেকে এ চালান ছুটে যেতো শেরপুর এমনকি নবীগঞ্জ ও সিলেট পর্যন্ত। আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে শুরু হয় হেরোইনের অভিযাত্রা। শ্রীমঙ্গলের জনৈক শিল্পপতি এবং মৌলভীবাজারের জনৈক বাস ম্যানেজারের মাধ্যমে বিলি-বণ্টনের সুবাধে হেরোইনের বাজার এখন প্রসারিত হয়েছে গ্রামাঞ্চলে।বর্তমানে হেরোইন হচ্ছে মাদকসেবীদের শীর্ষ উপকরণ। শহরের বিভিন্ন গডফাদার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের একাংশ হেরোইন ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। জড়িয়ে পড়ছেন অনেক মহিলারাও।পাশাপাশি এসব কাজে শিশুদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় মুক্তিযোদ্ধাদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে এ কাজে। শহরের হেরোইন ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামে-গঞ্জে। হেরোইন ছাড়াও ইয়াবা, গাজার বড় বড় চালান মৌলভীবাজার শহরসহ জেলার অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও যাচ্ছে।

এদিকে কেরু এ- কোং এর বাংলা মদ প্রচলিত রয়েছে জেলার ৯২টি চা বাগান এলাকাতে বৈধ ডিলারের মাধ্যমে বাংলা মদ বণ্টন হয় প্রতি সপ্তাহে। সূত্রমতে, বর্তমানে মৌলভীবাজারে হেরোইনের বড় চালান আসে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার বুধন্তি থেকে সড়কপথে। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ট্রেনযোগে হেরোইন পৌঁছে শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া রেলজংশনে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দায়িত্বরত র‌্যাব-৯ সদস্যরা শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, হবিগঞ্জ, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গত ১০ মাসে বিপুল পরিমাণ হেরোইন উদ্ধার করে। এছাড়া বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধ্বংসও করা হয়। এসবের সাথে জড়িত হেরোইন ব্যবসায়ীদেরও আটক করা হয়। মামলাও হয়েছে। তবে কোনোভাবেই মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে জেলার সীমান্তবর্তী বড়লেখায় ইয়াবা, হেরোইন, মদ, গাঁজা সবকিছু চলছে সমানতালে। থানা পুলিশকে মোটা অংকের মাসোহারা দিয়ে চলছে এসব। পৌর শহরের একটি প্রতিষ্ঠিত দোকানেও মদ বিক্রি হলেও রহস্যজনক কারণে নীরব পুলিশ। এ উপজেলার ৩টি সীমান্ত এলাকা দিয়ে বিশেষ করে শাহবাজপুর, বোবারথল সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিনই মাদক আসছে। এ কাজে সহায়তা করছে সেখানকার দায়িত্বরত বিজিবি জওয়ানরা। প্রায় প্রতিদিনই মাদক প্রবেশ করলেও বিজিবি মাদক ব্যবসায়ীদের গোপন রফাদফায় ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ অহরহ। থানা পুলিশও মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা গড়েছে।

তাই মাঝে-মধ্যে তারাও স্পিডমানির বিনিময়ে ছেড়ে দেয়-এমন অভিযোগ রয়েছে। তবে থানা পুলিশ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই অবস্থা জুড়ী উপজেলায়ও। জুড়ীতে মাদকের বিস্তারও সবচেয়ে বেশি। এর চেয়ে আরও ভয়ংকর তথ্য হলো জুড়ীতে অনেক শিশুই আইকা নামক একটি নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। ছিন্নমূল অনেক শিশুই এ নেশায় বুদ হয়ে থাকে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।পুরো জেলায় মাদকের বিস্তার বিষয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৯) শ্রীমঙ্গল এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, র‌্যাব সদস্যরা প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ পেয়ে হেরোইন, ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করছে। মামলাও দেওয়া হচ্ছে। তবে মাদকের বিস্তার রোধ করতে গণসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

সর্বশেষ খবর

………………………..