সাত টুকরা করে বুড়িগঙ্গায় লাশ ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ডিআইজি মিজান

প্রকাশিত: ১২:৫৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৮

Sharing is caring!

ক্রাইম সিলেট ডেস্ক : তুলে নিয়ে বিয়ে করার অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির সামনে লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন ডিআইজি মিজানুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তার ইকো। ৯ পৃষ্ঠার লিখিত জবানবন্দিতে তার ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের ভয়াবহ সব চিত্র তুলে ধরা হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত জবানবন্দি গ্রহণ করেন পুলিশ সদর দফতর থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি। জবানবন্দির একটি কপি প্রতিবেদকের কাছে এসেছে।

জবানবন্দিতে ১ থেকে ২০ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়। উল্লেখযোগ্য হিসেবে প্রথমে জোরপূর্বক বিয়ে করার পুরো ঘটনা তুলে ধরেন ইকো। বলা হয়, ২০১৭ সালের ১৪ জুলাই বিকালে তাকে পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের সামনে থেকে তুলে তিনশ’ ফুট এলাকায় নিয়ে যান ডিআইজি মিজান।

সেখান থেকে রাতে বেইলি রোডে তার ফ্ল্যাটে আনা হয়। এর মধ্যে মারধরসহ নির্যাতনের ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরা হয়। বাসায় আনার পর দ্বিতীয় দফা নির্যাতন শুরু হয়। এ সময় সেখানে ডা. গাজি শামীম হাসান উপস্থিত ছিলেন। বলা হয়, সেখানে তাকে ওষুধ খাওয়ানো হয়। এরপর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।

পরদিন দুপুর ১২টার দিকে নিজেকে ডিআইজি মিজানের স্লিপিং ড্রেস পরা অবস্থায় দেখতে পান। সেখানে তিন দিন আটকে রেখে ১৭ জুলাই রাতে মগবাজার থেকে নুরুল হক নামে একজন কাজী ডেকে এনে জোরপূর্বক বিয়ে করতে বাধ্য করেন। বিয়ের পর তাকে মায়ের জিম্মায় মুক্তি দেয়া হয়।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে বলা হয়, ডিআইজি মিজানের বাধার কারণে ২৮ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষা দিতে পারেননি ইকো। প্রতিবাদ করলে তাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়। চুল ধরে টেনে বেইলি রিজের লিফটে তোলা হয়। এরপর ফ্ল্যাটের ভেতরে নিয়ে তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে ভয়ে তিনি একটি বেডরুমে আশ্রয় নেন।

পরে শিলপাটা আর পাথর দিয়ে দরজা ভেঙে আরেক দফা শারীরিক নির্যাতন করেন। পরবর্তী সময়ে ভাড়াটিয়া পরিচয়ে অজ্ঞাতনামা ৪ ছেলে আসে ফ্ল্যাটে। কিন্তু তারা ভাড়াটিয়া ছিল না। তাদেরকে সামনে বসিয়ে রেখে আমাকে মারধর করা হয়। তাদেরকে হুকুম দেয়া হয় কাপ্তান বাজার থেকে কসাই ডাকতে। তাকে (ইকো) ৭ ভাগ করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দিতে বস্তা আনতে বলা হয়।

ওইদিন রাত ৮টার দিকে সোহেলিয়া আনার রত্না (ডিআইজি মিজানের প্রথম স্ত্রী) বেইলি রিজের বাসায় আসেন। সঙ্গে মুক্তা ভাবি নামে আরও একজন ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে ইকোকে থাপ্পড় মারেন মিজানুর রহমান। এরপর রমনা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান সেখানে আসেন। তিনি কীভাবে এই ফ্ল্যাটে ঢুকেছেন তা জানতে চান। স্বামী মিজানুর রহমানের সঙ্গে এসেছেন বলে জানান ইকো।

লিখিত জবানবন্দিতে বলা হয়, ১৯ আগস্ট ইকোকে বেইলি রোডের বাসায় রেখে ডিআইজি মিজান চিকিৎসার নামে সিঙ্গাপুর যান। এ সময় তার বড় স্ত্রীও ছিলেন। ৬ দিন পর্যন্ত তিনি ওই ফ্ল্যাটে তালাবদ্ধ ছিলেন বলে দাবি করেন। এ সময় বাসার গৃহকর্মীকেও ছুটি দেয়া হয়। ২৫ আগস্ট পর্যন্ত তার বেইলি রোডের ফ্ল্যাটেই ছিলেন তিনি।

ইকোর প্রশ্ন- ১৩ আগস্টের কথা উল্লেখ করে ভাংচুরের যে মামলা সাজানো হয়, সেখানে তাকে পলাতক দেখানো হল কীভাবে? নথিপত্রে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বার্তা দিয়ে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। অথচ তিনি ওই ফ্ল্যাটেই ছিলেন। ফ্ল্যাটের সিসিটিভি ফুটেজ দেখলেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে বলেও দাবি করেন ইকো। ৮ সেপ্টেম্বরের আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ওইদিন আবারও বেইলি রোডের বাসায় যান।

এ সময় জাহাঙ্গীর (বডিগার্ড) বাসার নিচ থেকেই তার হাতে ফ্ল্যাটের চাবি দেন। সেটিও সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া যাবে। রাত ২টায় বাসায় ফেরেন ডিআইজি মিজান। ওই সময় একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের সংবাদপাঠিকা তাকে ফোন করেন। এ নিয়ে কথা বলায় তাকে চোখের কাছে ঘুষি মারেন ডিআইজি মিজান। ওই আঘাতে চোখ ফুলে যায়। ৪ অক্টোবরের একটি ঘটনা স্মরণ করে ইকো জবানবন্দিতে বলেন, নিকেতনে তার এক বন্ধুর রেস্টুরেন্টে ডিনার করাতে নিয়ে অত্যাচার করা হয়। সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জনকে কাস্টমার হিসেবে রাখা হয়।

পরবর্তী সময়ে ইস্যু সৃষ্টি করে ঝগড়া বাধিয়ে সবার সামনে নির্দয়ভাবে তাকে মারতে থাকেন ডিআইজি মিজান। এরপর তার তলপেটে ও শ্বাসনালিতে জুতা পরা অবস্থায় লাথি মারা হয়। এ অবস্থায় গলার স্বর বন্ধ হয়ে যায়। ২০নং অভিযোগে বলা হয়, জেল থেকে বের হওয়ার পর সমঝোতার নামে একটি নতুন নাটক সাজায় মিজান। ড্রাইভার গিয়াস এবং ভাগিনা পরিচয় দেয়া সাইফুলকে দিয়ে পারিবারিক সমঝোতার প্রস্তাব পাঠান। এ নিয়ে অভিভাবকদের সামনে আপসনামা চাইলে উত্তেজিত হয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করেন।

এরপর ১৯ জানুয়ারি গিয়াস এবং সাইফুলকে পাঠিয়ে ক্ষমা চেয়ে সাক্ষাৎ করতে চান মিজান। তিনি তদন্ত কমিটিতে তার শিখিয়ে দেয়া বক্তব্য দিতে বলেন। গিয়াস এবং ভাগিনা সাইফুল এ প্রস্তাব নিয়ে আসে। এর একটি অডিও-ও সংযুক্ত করেন ইকো। নিজের পরিবার এবং ইকোকে জিম্মি করে সাইফুল এবং গিয়াসকে দিয়ে তদন্ত কমিটির কাছে পাঠায়। তদন্ত কমিটির রুম পর্যন্ত মিজানের ভাগিনা সঙ্গে ছিলেন।

ওদিকে বছিলার বাসায় তার ভাই ও মা তার (ডিআইজি মিজান) কব্জায়। যে কারণে ২১ জানুয়ারি সাক্ষ্য দেয়ার ক্ষেত্রে সত্য গোপন ছাড়া তার আর কোনো সুযোগ ছিল না। জবানবন্দির শেষ প্যারায় ইকো বলেন, ‘১ম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ঘটনা সত্য। তার বাইরে মিথ্যা বা বাড়তি কথা নেই। আমি চাইব সবটুকু তদন্ত হোক। তারিখ অনুযায়ী প্রত্যেকটি কল লোকেশন সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই-বাছাই করা হোক। আমি প্রতারিত হয়েছি। আমি প্রতারণার স্বীকার। কাউকে প্রতারিত করিনি। আশা করি এটি একটি সুষ্ঠু এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি। তাই সুষ্ঠভাবে তদন্ত করার অনুরোধ জানাচ্ছি। এটাই আমার বক্তব্য।’ জবানবন্দিতে দেয়া অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয় ডিআইজি মিজানুর রহমানের ব্যক্তিগত সেলফোনে। কিন্তু তা বন্ধ পাওয়া যায়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

February 2018
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  

সর্বশেষ খবর

………………………..

shares